হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, নাইরোবিতে অবস্থিত ইজলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সাংস্কৃতিক কাউন্সিল, কেনিয়ার 'ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ' এবং 'APBET কেনিয়া' শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সহযোগিতায় পাঁচ দিনব্যাপী একটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্স অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর শিরোনাম ছিল "ইসলামের সাথে পরিচিতি এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপ"। এই কোর্সের মূল লক্ষ্য ছিল আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষা অনুসারে বিশুদ্ধ মুহাম্মদী ইসলামের (সা.) আদর্শ ব্যাখ্যা করা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ শক্তিশালী করা, বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রচার করা এবং শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের ক্ষমতায়ন করা।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কেনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষক, প্রশিক্ষক, গবেষক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা ছিলেন। এই কর্মসূচিটি ইরান ও কেনিয়ার মধ্যে বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধির একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
তাওহীদ: মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং নৈতিক দায়িত্বশীলতার ভিত্তি
কোর্সটিতে বিশ্বাস, নৈতিকতা, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সংলাপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক শিক্ষামূলক প্রযুক্তির মতো বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বিশ্বাস সংক্রান্ত অংশে তাওহীদ (একত্ববাদ), পুনরুত্থান, মহাবিশ্বে মানুষের অবস্থান এবং ইসলামি সভ্যতায় বিজ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়। তাওহীদকে মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং নৈতিক দায়িত্বশীলতার মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত ও সামাজিক নৈতিকতার ক্ষেত্রে সততা, ন্যায়বিচার, অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, দায়িত্বশীলতা এবং মানব সমাজ বিকাশে নৈতিকতার ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি মানব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, শান্তি, সহাবস্থান এবং সংলাপের নীতিগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। ইসলামি শিক্ষার অংশে আগামীর প্রজন্মকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা, নৈতিক মূল্যবোধের সঞ্চার এবং সমাজের বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
হযরত ফাতিমা জোহরা (সা.): বর্তমান যুগে মুসলিম নারীর পূর্ণাঙ্গ আদর্শ
নারী ও পরিবার সংক্রান্ত আলোচনায় নারী ও পুরুষের মানবিক মর্যাদা, ইসলামে পরিবারের অবস্থান এবং মুসলিম নারীর উজ্জ্বল আদর্শ হিসেবে হযরত ফাতিমা জোহরা (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তঃধর্মীয় সংলাপের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিক সাধারণ মূল্যবোধের স্বীকৃতি, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য গ্রহণ এবং গোঁড়ামিতা এড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর কুরআনের ভিত্তি আলোচনা করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা ইসলামি সমাজে ধর্মীয় সহাবস্থানের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানার পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে শান্তি ও বোঝাপড়া বৃদ্ধির উপায় নিয়ে মতবিনিময় করেছেন।
এই কোর্সের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল ধর্মীয় সংলাপ সম্পর্কে ইমাম শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনেইর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মাজহাব ও ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং শান্তি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও জাতিসমূহের মধ্যে বোঝাপড়া বৃদ্ধির জন্য মানবিক ও নৈতিক সাধারণ সক্ষমতা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা।
সংলাপ: জাতিসমূহের মধ্যে সহাবস্থান ও গঠনমূলক মিথস্ক্রিয়ার কার্যকর সমাধান
এই অংশে ভুল বোঝাবুঝি কমানো, উগ্রবাদ মোকাবিলা এবং বিভিন্ন সমাজের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে 'সংলাপ'-এর ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কোর্সের বিভিন্ন অংশে যুদ্ধ ও সহিংসতার মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে জায়নবাদী শাসনের পক্ষ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর হামলা এবং এর মানবিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়।
কোর্সের বক্তারা দেশের নেতা, কমান্ডার, বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের গণশহাদাতের কথা উল্লেখ করে জোর দিয়ে বলেন যে, এই হামলাগুলো কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে করা হয়নি, বরং ইরানের বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে করা হয়েছে।
এছাড়াও স্কুল, হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ঐতিহাসিক স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং নিরপরাধ নারী ও শিশুদের মৃত্যু (যেমন মিনাব স্কুলের শিশুদের ঘটনা) যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির উদাহরণ হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে।
এ অংশে জোর দেওয়া হয়েছে যে, অসামরিক ব্যক্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা কেন্দ্র এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে লক্ষ্যবস্তু করা মানবিক ও নৈতিক আদর্শ এবং ঐশ্বরিক ধর্মের শিক্ষার পরিপন্থী। এমনকি যিশু খ্রিস্ট (আ.)-এর ভালোবাসা, শান্তি, মানুষের জীবনের পবিত্রতা এবং নিরপরাধদের সুরক্ষা সংক্রান্ত শিক্ষার সাথেও এটি সাংঘর্ষিক।
অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাহ্যিক হুমকির মোকাবিলায় ইরানি জনগণের ঐক্য, সংহতি এবং একাত্মতা। এখানে উল্লেখ করা হয় যে, ইরান তার সমসাময়িক ইতিহাসে বারবার প্রমাণ করেছে যে, চাপ, হুমকি এবং বুদ্ধিজীবী ও নেতাদের শাহাদাত জাতীয় ইচ্ছাশক্তিকে দুর্বল করার পরিবর্তে সামাজিক সংহতি, আত্মবিশ্বাস এবং অগ্রগতির পথকে আরও শক্তিশালী করেছে।
কেনিয়ার APBET শিক্ষক সমিতির সভাপতি স্যামুয়েল এমবুগো এই ধরনের কর্মসূচি শিক্ষক, প্রশিক্ষক ও যুবকদের জন্য অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান এবং জ্ঞান বৃদ্ধি, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক সহযোগিতা সম্প্রসারণে এই কোর্সগুলোর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আপনার কমেন্ট